চ্যালেঞ্জ দেখছে আ. লীগ-বিএনপি

আওয়ামীলীগ
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

চ্যালেঞ্জ দেখছে আ. লীগ-বিএনপি

অনলাইন ডেস্ক : নরসিংদী সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে নরসিংদী-১ আসন। এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতীক)। আগামী নির্বাচনে এ আসনে দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে দলটির প্রভাবশালী নেতা, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা সভাপতি খায়রুল কবীর খোকন অনেকটাই নিশ্চিত। তবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৃণমূলে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনজুর এলাহী। এ ছাড়া সম্প্রতি জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে পোস্টার, ফেস্টুন করে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।

আর জাতীয় পার্টি থেকে মো. শফিকুল ইসলাম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।

জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনের প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের মুসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া। এরপর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে তাঁকে পরাজিত করে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মোমেন খান নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৬ সালে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মেজর সামসুল হুদা বাচ্চু। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে বিএনপির সামসুদ্দীন আহমেদ এছাক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সামসুদ্দীন আহমেদ এছাক ১৯৯১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনের উপনির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবীর খোকন বিজয়ী হন। ১৯৯১-২০০৬ পর্যন্ত এই আসনটি ছিল বিএনপির দখলে।

পরে ২০০৮ সালের নবম এবং ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম হীরু নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ : রাজনীতিতে এসেই এই আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট বাগিয়ে বাজিমাত করেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। পরে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় থেকে নিজের শক্ত ভিত গড়ে তোলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

দলীয় সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনের জন্য নজরুল ইসলাম হীরু মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খানও দলীয় প্রার্থী হতে আগ্রহী। এরই মধ্যে তিনি তাঁর নিজ এলাকা হাজীপুর ইউনিয়নে ব্যাপক নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন।

তবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নজরুল ইসলাম হীরুকে এগিয়ে রাখছে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, নজরুল ইসলাম হীরু দলের জেলা সভাপতি হওয়ার পর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নরসিংদীতে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটা সুসংগঠিত। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। আর নির্বাচনী এলাকার মধ্যে দুর্গম চরাঞ্চল চারটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ বাসিন্দার দুদর্শা লাঘবে মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করছেন।

নরসিংদী পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘আমাদের আসনে জেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক নজরুল ইসলাম হীরু ভাইই মনোনয়ন পাবেন। এমপি হিসেবে ওনার কোনো বিকল্প নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে সততা। এ ছাড়া তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। যেকোনো বিপদ-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ান। মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত নরসিংদী যাতায়াত করেন।’

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সফর আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘নজরুল ইসলাম হীরু ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা। এখন হয়েছেন আমাদের নেতা। তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা কাজে লাগিয়ে আজ আওয়ামী লীগকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছেন। আগামীতেও আমরা ওনাকে ছাড়া অন্য কিছু চিন্তাই করছি না।’

তবে এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খান বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে, সেই সড়ক থেকে নরসিংদী অনেকটা পিছিয়ে। তাই সদর আসনে দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ নেতৃত্বে পরিবর্তন চাচ্ছে। আর ওনাকে দুবার যারা এমপি হিসেবে জয়যুক্ত করেছে, তিনি সেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে দল থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। পাশাপাশি দলে বিএনপি, জামায়াত ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে পদ দিয়ে দলের ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছেন। আমার দাবি, হীরু ভাই তো দুবার দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার আমাকে সুযোগ দেবেন বলে আশা করছি।’

বিএনপি : ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নরসিংদীর সব কয়টি আসনেই ধানের শীষের জয় হয়। পরে জেলার অন্য আসনগুলো বিভিন্ন সময় হাতছাড়া হলেও এক-এগার পর্যন্ত সদর আসনে একক কর্তৃত্ব ধরে রাখে বিএনপি। তবে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার গণজোয়ারে ধানের শীষের সব আসন ভেসে যায়।

তবে এর আগে থেকেই বিএনপিতে কোন্দল শুরু হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত ২০০৫ সালে নরসিংদী-১ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নকে ঘিরে কোন্দল শুরু। পরে ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার জনসভা ঘিরে নরসিংদীর দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি এক হয়। এর পর থেকে এককভাবে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা সভাপতি খায়রুল কবীর খোকন।

জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা খায়রুল কবীর খোকনকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক প্রার্থী হিসেবেই মনে করছে।

তবে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মনজুর এলাহী এই আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক নেতা দলের জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ। তিনি এ আসনে বিএনপির তিনবারের সংসদ সদস্য সামসুদ্দীন আহমেদ এছাকের ছেলে।

নরসিংদী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন, ‘খায়রুল কবীর খোকনই সদর আসন থেকে আমাদের একক প্রার্থী। মনজুর এলাহী আমাদের কখনো বলেননি তিনি সদর আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হতে চান।’

সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘খায়রুল কবীর খোকনের নেতৃত্বে বিএনপি সুসংগঠিত। এখানে কোনো কোন্দল নেই। যদি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় তাহলে খোকন ভাইয়ের বিজয় কেউ আটকাতে পারবে না।’

তবে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনজুর এলাহী বলেন, ‘এখন নরসিংদীতে বিএনপির অবস্থান বেশ দুর্বল। বর্তমানে নেতাকর্মীরা নতুন নেতৃত্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই আমার নেত্রী দলকে সুসংগঠিত করতে ও বিএনপির ঘাঁটি সদর আসন পুনরুদ্ধার করতে আমাকে মনোনয়ন দেবেন বলে আশা করছি।’

জাতীয় পার্টি ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন : জাতীয় পার্টি থেকে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (চরমোনাই) থেকে আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী।