লোকসানের অপর নাম রেলওয়ে

অর্থনীতি
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

লোকসানের অপর নাম রেলওয়ে


আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে রেলকে। গত আট অর্থবছরে রেলে ব্যয় করেছে ৩৮ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। শুধু উন্নয়ন প্রকল্পেই বিনিয়োগ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৮৬ কোটি। বাকিটা ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে। চলতি বছরের বরাদ্দ ধরলে ব্যয় ছাড়াবে ৫০ হাজার কোটি। কিন্তু বিনিয়োগের টাকা উঠে আসা দূরের ব্যাপার, পরিচালন ব্যয়ই তুলতে পারছে না রেল।


চলতি অর্থবছরের বাজেটে রেলের জন্য বরাদ্দ ১৬ হাজার ১৩ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় অর্থাৎ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ১৩ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা পরিচালন ব্যয়।


এত বিনিয়োগের পরও লাভের মুখ দেখেনি রেল, লোকসান বাড়ছে বছর বছর। বিনিয়োগ দূরে থাক, পরিচালন ব্যয়ই উঠছে না। প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে গত আট অর্থবছরে রেলের আয় মাত্র ছয় হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। লোকসান সাত হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে শুধু পরিচালন খাতেই লোকসান এক হাজার ২২৬ কোটি টাকা।


আট অর্থবছরে ১৪ হাজার ৬০২ কোটি টাকা ব্যয় হয় রেল পরিচালনায়। এ টাকা খরচ হয়েছে রেলের ৩০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, ট্রেন পরিচালনা ও স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণে। নতুন রেলপথ নির্মাণ, পুরনো লাইন সংস্কার, ইঞ্জিন-বগি কেনা, স্টেশন নির্মাণসহ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে উন্নয়ন খাতে অর্থাৎ বিনিয়োগ হিসেবে। এ ব্যয় ৯ বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।


৯ বছরে প্রায় অর্ধ লাখ কোটি টাকা খরচের পরও রেল কেন লোকসানি? এ প্রশ্নের জবাব নেই রেলের কাছে। রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেছেন, 'মুনাফা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তাদের লক্ষ্য উন্নত সেবা। সরকারের নীতি অনুযায়ী, রেলের লক্ষ্য হবে 'নো লস, নো প্রফিট'। লাভ না হলেও লোকসান যেন না হয়।'


বিনিয়োগ উঠে আসা দূরে থাক, শুধু পরিচালনা খাতেই বছরে হাজার কোটি টাকা লোকসানের জন্য ১২ বছর আগের বিএনপি শাসনামলকে দায়ী করেছেন রেলমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'বিএনপির আমলে একের পর স্টেশন বন্ধ করা হয়েছে। রেলপথ বন্ধ করা হয়েছে। একটি কোচ, ইঞ্জিন কেনা হয়নি। রেল মরে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ রেলকে বাঁচিয়ে তুলেছে। ২৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আরও ৪৩টির কাজ চলছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে লাভের মুখ দেখবে বলে রেল।'


রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ৯ বছরে নতুন রেলপথ বেড়েছে ২৩৬ কিলোমিটার। ডুয়েল গেজ হয়েছে ২৪৮ কিলোমিটার। উন্নয়ন ও পুনর্বাসন করে চালু করা হয়েছে এক হাজার ৯০ কিলোমিটার বন্ধ রেলপথ। স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে ৬৭টি। সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ১৬০টি। ১৭৯টি নতুন রেলসেতু নির্মিত হয়েছে। ৯ বছরে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনা হয়েছে ৪৬টি। কোচ (বগি) কেনা হয়েছে ২৭০টি। ট্রেন বেড়েছে ১০টি।


রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, বিপুল বিনিয়োগে সক্ষমতা বাড়লেও লোকসান বন্ধ হয়নি। কিন্তু পাশের দেশ ভারতের রেল বছর বছর মুনাফা করছে। ২০১৬ সালে ভারতীয় রেল নিট মুনাফা ২৯ হাজার কোটি রুপি। পণ্য পরিবহনে মুনাফা করেছে ৫৪ হাজার কোটি রুপি। লাভের বড় অংশ তারা ভর্তুকি দিয়েছে যাত্রী পরিবহনে। কিন্তু বাংলাদেশে রেলে পণ্য পরিবহন কমছে বছর বছর।


পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক তার গবেষণার বরাতে জানান, সারাদেশে বছরে ২৩ লাখ কনটেইনার মালপত্র পরিবহন হয়। এর ৯৩ শতাংশই হয় সড়কপথে। ৭ ভাগ হয় রেলে। রেলওয়ের হিসাবেই, এক দশক আগেও ১২ ভাগ পণ্য পরিবহন করত সংস্থাটি।


আয় বাড়াতে গত ছয় বছরে দুই দফা ভাড়া বাড়িয়েছে রেল। ২০১২ সালে ১০০ থেকে ২৫০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালের ভাড়া বাড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশ। তাতে আয় খুব বাড়েনি। গত অর্থবছরে পরিচালনা খাতে দুই হাজার ৫৩২ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে রেল আয় করে এক হাজার ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে যাত্রী পরিবহনে আয় হয়েছে ৭৮৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পণ্য পরিবহনে আয় মাত্র ২৮৩ কোটি টাকা। আয়ের মাত্র ২১ ভাগ এসেছে পণ্য পরিবহনে।


২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলের আয় ছিল এক হাজার ২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। যাত্রী পরিবহনে আয় ছিল ৫৯৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বাকি ২০৪ কোটি টাকা পণ্য পরিবহনে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ভারতীয় রেল আয় করে এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি রুপি। এক লাখ নয় হাজার কোটি রুপি আসে পণ্য পরিবহন থেকে। ভারতীয় রেলের আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই পণ্য পরিবহন থেকে। বাংলাদেশে তা ২০ শতাংশেরও কম।


পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যাত্রী পরিবহনে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ ভর্তুকি দেয়। লোকসান পুষিয়ে নেয় পণ্য পরিবহনে। কিন্তু বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনে নজর নেই। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি রেলের গড় আয় ৫৬ পয়সা। ব্যয় এক টাকা ৫২ পয়সা। পণ্য পরিবহনে প্রতি টনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২২ পয়সা। আয় দুই টাকা পাঁচ পয়সা। ২০০১-০২ অর্থবছরেও দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের আয় ছিল প্রায় সমান। ১৬ বছর পর পণ্য পরিবহন আয় ২০ ভাগে নেমে এসেছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে রেলযাত্রী ছিল তিন কোটি ৯১ লাখ ৬২ হাজার। পণ্য পরিবহন করে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার টন। ১৫ বছর পর রেলে যাত্রী বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত কোটি ২২ লাখে, পণ্য পরিবহন কমে হয়েছে ২৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪০ টন।