‘এলএনজি’ নিশ্চয়তায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা

অর্থনীতি
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

‘এলএনজি’ নিশ্চয়তায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা


আমদানি হয়ে আসা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ঘিরে বড় স্বপ্ন দেখছেন চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প উদ্যোক্তারা। আগামী এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর মে মাসে চট্টগ্রামে অগ্রাধিকার দিয়ে এই গ্যাস শিল্প-কারখানায় সংযোগ দেওয়া হবে।

এই অবস্থায় এলএনজি আমদানি ঘিরে চট্টগ্রামে বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তাঁদের কেউ কারখানা সম্প্রসারণ করছেন, আবার কেউ নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন।  এরই মধ্যে প্রায় আড়াই শ উদ্যোক্তা এলএনজি সংযোগ নিতে আবেদন করেছে।

এলএনজি আসাকে সামনে রেখে কারখানা সম্প্রসারণ করছেন রিজেন্ট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলএনজি আমদানি ঘিরেই আমাদের হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ কাজ চলছে। নিটওয়্যার, স্পিনিং, গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল খাতের সব কারখানার জ্বালানি হচ্ছে এই গ্যাসনির্ভর। গ্যাস না থাকায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক বছর এই সম্প্রসারণ কাজ শুরু করতে পারিনি। গ্যাস আসা নিশ্চিত হওয়ার পর এখন পুরোদমে কাজ চলছে।’

এলএনজি গ্যাসের যে প্রস্তাবিত দর দেওয়া হয়েছে সেটি এখন বেশি, এটা বিবেচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার পরামর্শ দেন তিনি।

গ্যাস সংযোগে ১২ বছর আগে আবেদন করে রেখেছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এসটেক গ্রুপ। গ্যাসভিত্তিক নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ক্যাপটিভ পাওয়ার দিয়ে একটি প্লাস্টিক প্যাকেজিং সামগ্রী চালানোর ইচ্ছা ছিল তাদের। এখন এলএনজি পাওয়ার আশায় আমেরিকা থেকে জেনারেটর আমদানির ঋণপত্র খুলে রেখেছে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ সেটি চট্টগ্রামে পৌঁছবে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিশেষায়িত কারখানাটি এখন ডিজেল দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতে চলছে। এলএনজি পেলে আমরা ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করব। সেটি দিয়ে জুনের প্রথমভাগে কারখানা চলবে।’

এই ধরনের অনেক শিল্প উদ্যোক্তা কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন কারখানা গড়ে তুলছেন এলএনজি আমদানি ঘিরে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম মনে করেন, এলএনজি আমদানি চট্টগ্রামে শিল্প ও বিনিয়োগে নতুন দুয়ার খুলে দেবে। ১০ বছর ধরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও আবাসিক গ্রাহকরা গ্যাস সংকটে আছেন, যাঁরা গ্যাস পাচ্ছেন তাঁরাও গ্যাসের চাপ সংকটে ছিলেন। চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পমালিকরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কঠোর তদারকির কারণে নির্দিষ্ট সময়েই আমরা এই গ্যাস পাচ্ছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা পেলে চট্টগ্রামে অন্তত পাঁচশত শিল্প গ্রাহকের আবেদন পড়বে। চট্টগ্রাম ঘিরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উন্নয়ন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এলএনজির দর অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।

উদ্যোক্তাদের শঙ্কা ছিল, এলএনজির দাম সারা দেশে একই হারে নির্ধারিত হবে কি না। আর দামই বা কেমন হবে। এ ছাড়া এলএনজি চট্টগ্রামে সংযোগ না দিয়ে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে কি না। এসব শঙ্কার কারণে অনেকে আবেদন করলেও ডিমান্ড ন্যুট ইস্যু বা টাকা জমা দেয়নি; কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে এলএনজিসংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম শঙ্কাগুলো দূর করেন এবং নিশ্চয়তা দেন এলএনজির দাম অবশ্যই ব্যবসায়ীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে, আমদানীকৃত গ্যাস যা আসবে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম পাবে, আর সারা দেশে একইহারে দর নির্ধারিত হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সাল থেকেই চট্টগ্রামে শিল্প ও আবাসিক খাতে গাসের জন্য হাহাকার চলছে। এরপর সংকট বেড়ে যাওয়ায় বিগত ২০১২ সাল থেকে চট্টগ্রামে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। এই অবস্থায় হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আমদানি করে ব্যাংকঋণের সুদ মেটাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প উদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত এলএনজি পাইপলাইন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই স্থাপন সম্পন্ন করে। শুধু তাই নয়, আমেরিকার প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণকাজও শুরু করে। বর্তমানে এই কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। আর ২০১৭ সালেই কাতার থেকে বিশেষায়িত জাহাজে করে এলএনজি আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। আগামী ২৫ এপ্রিল জাহাজে করে দেশে প্রথমবার এই গ্যাস চট্টগ্রাম পৌঁছবে।
প্রথম টার্মিনাল থেকে ৫০০ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হবে। কাতার থেকে বিশেষায়িত জাহাজে করে আসা এই গ্যাস কক্সবাজারের মহেশখালী টার্মিনালে ভিড়ে সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পৌঁছবে। এরপর আরেকটি লাইনে চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানায় ১৫ মে থেকে এই সংযোগ দেওয়া হবে। দেশে প্রথমবার আসা এই গ্যাসের মধ্য দিয়ে বিগত ২০০৭ সাল থেকে চট্টগ্রামে চলমান গ্যাস সংকটের সুরাহা হতে যাচ্ছে।