হিমাগারে আলু সংরক্ষণ নিয়ে বিপদে কৃষক

অর্থনীতি
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

হিমাগারে আলু সংরক্ষণ নিয়ে বিপদে কৃষক


সাইফুল ইসলাম অনেক বছর ধরে আলু উৎপাদন করেন। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর ধীপুর গ্রামে তার বাড়ি। আলু সংরক্ষণের জন্য আগে থেকেই ৮০ কেজির পাটের বস্তা ক্রয় করেন। কিন্তু হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) কর্তৃপক্ষ বলেছে, আলুর বস্তা ৮০ কেজির পরিবর্তে হতে হবে সর্বোচ্চ ৫০ কেজি। তা না হলে আলু রাখা যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে- বাজারে ৫০ কেজির বস্তা পর্যাপ্ত নয়। আর এত কম সময়ে ওই বস্তা সংগ্রহ করে আলু সংরক্ষণ সম্ভব নয়। ফলে জমি থেকে উত্তোলন করা আলু নিয়ে এবার বেশ বিপাকে পড়েছেন এই আলুচাষি। এ ঘটনায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

শুধু জহিরুল নন, তার মতো সারাদেশের লাখ লাখ কৃষক হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে না পারার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা বলেন, হঠাৎ করে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের এ সিদ্ধান্ত তাদের কাছে 'বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো'। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চলতি মৌসুমে ৮০ কেজি বস্তায় আলু সংরক্ষণের জন্য মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের কাছে চিঠি দেন কৃষকরা। আগামী মৌসুম থেকে প্রস্তুতি নিয়ে ৫০ কেজি বস্তায় আলু সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

জানা যায়, রাজশাহীর পবা উপজেলা লোড-আনলোড কুলি শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৫ মার্চ দেওয়া রায়ে বলা হয়, হিমাগারে আলুর বস্তা বহনে পুরুষ শ্রমিক ৫০ কেজি ও নারী শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৩০ কেজির বেশি ভার বহন করা যাবে না। প্রচলিত শ্রম আইন ও বিধির এমন বিধান প্রয়োগের নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, যারা এ আইন মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ওই রায় কার্যকর হওয়ার পর থেকে এর অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী চার মাসের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের আদেশ কার্যকর করতে পরের দিনই সংশ্নিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

সম্প্রতি এ রায় কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। যেসব হিমাগার এ নির্দেশ মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে এ বিভাগ। এ কারণে কৃষকদের কাছ থেকে ৮০ কেজির আলুর বস্তা নিচ্ছেন না হিমাগারের মালিকরা।

৫০ কেজি বস্তা ব্যবহারে বাধ্য করার প্রতিবাদে এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, রংপুরসহ আরও অনেক জেলায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তারা বলেন, মাঠ থেকে আলু উত্তোলনের আগেই বেশিরভাগ কৃষক ৮০ কেজি ওজনের বস্তা ক্রয় করেন। বাজারে পর্যাপ্ত পাটের বস্তাও নেই। তা ছাড়া এখনই আলু সংরক্ষণের উপযুক্ত সময়। ফলে এ সময় হিমাগারে আলু না রাখতে পারলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এতে উভয় সংকটে পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও। একদিকে আইন মানার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে কৃষকদের বাস্তব অবস্থা ভেবে তাদের কথাও ফেলতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেও সমাধান পাননি তারা। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শনিবার জরুরি বৈঠকে বসেন হিমাগার মালিকরা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, চাহিদামতো ৫০ কেজির বস্তা না পাওয়ায় তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ পাটকল সমিতির (বিজেএমএ) মিলগুলোতে ৫০ কেজির বস্তা তৈরির নির্দেশনা দেওয়ার জন্য আবেদন জানানো হবে।

এ বিষয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, হাইকোর্টের দেওয়া রায় কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় সরকারের নয়। আলু উত্তোলনের আগেই কৃষকরা ৮০ কেজির বস্তা ক্রয় করে রাখেন, তাদের এখন কী হবে- এ প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, হিমাগারের মালিক এবং কৃষকসহ সংশ্নিষ্টরা বসে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এখানে সরকারের করার কিছুই নেই। বাজারে ৫০ কেজি পাটের খালি বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না- এর উত্তরে প্রতিমন্ত্রী জানান, অভিযোগ সঠিক নয়।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত সচিব) সামছুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, কৃষকের সমস্যা তাদের দেখার দায়িত্ব নয়। হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, নির্ধারিত ওজনের বেশি ভার বহন করা যাবে না। উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশ কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক সামশুল আলম খান বলেন, পাটের বস্তা না পাওয়ার ফলে সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিজেএমসির সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলেছে, শিগগিরই কৃষকদের ৫০ কেজির বস্তা সরবরাহ করা হবে। ফলে সংকট কেটে যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এক কোটি ১৩ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। এবার প্রায় একই পরিমাণ উৎপাদন হবে বলে জানান সংশ্নিষ্টরা। গত বছর আলু উৎপাদনে সাত টাকা ৪০ পয়সা ব্যয় হয়েছে। এবার প্রায় সাড়ে সাত টাকা। বর্তমানে জমি থেকে এ আলু পাঁচ থেকে সাত টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষক। অন্যদিকে বস্তা নিয়েও দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।

অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, সারাদেশের মোট ৪১৬টি হিমাগারের মধ্যে মাত্র ৩০টি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের। বাকি ৩৮৬টি হিমাগার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব হিমাগারের বেশিরভাগই আলু সংরক্ষণে ব্যবহূত হচ্ছে। গত বছর দেশের হিমাগারগুলোতে ৫২ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। এবারও একই পরিমাণ আলু সংরক্ষণের প্রস্তুতি রয়েছে। এই পরিমাণ আলু ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তায় সংরক্ষণে মোট সাড়ে ১০ কোটি পিস লাগবে। আর ৮০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তা লাগবে সাড়ে ছয় কোটি। এখন হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, পুরুষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৫০ কেজি ও নারী শ্রমিকের জন্য ৩০ কেজি বস্তা ব্যবহার করা হলে মোট বস্তা লাগবে প্রায় ১৪ কোটি। এবার চলতি মাস থেকে আলু সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। আগামী মাস পর্যন্ত হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হবে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিজেএমসির কাছ থেকে ৪৪৫ কোটি টাকার পাটের ব্যাগ কিনতে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সমঝোতা স্মারক সই করে। এমওইউ অনুযায়ী, বিজেএমসি ১০ কোটি ৬০ লাখ পিস বস্তা সরবরাহ করার কথা। ৫০ কেজি আলুর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্রতি বস্তার দাম পড়বে ৪২ টাকা। কিন্তু হিমাগার মালিকরা বস্তা কেনার আদেশ দিলেও বিজেএমসি চাহিদামতো দিতে পারছে না।

হিমাগার মালিকরা যা বললেন : বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কামরুল হোসেন চৌধুরী গোর্কী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ৮০ কেজি বস্তায় আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হঠাৎ করে প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ জন্য আরও সময় দিতে হবে। তিনি জানান, এখন হিমাগারে আলু রাখার ভরা মৌসুম চলছে। চাহিদা অনুযায়ী ৫০ কেজি বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া বেশিরভাগ কৃষক আগে থেকেই ৮০ কেজির পাটের বস্তা কিনে প্রস্তুতি নিয়েছেন। ৫০ কেজি বস্তা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলে চলতি বছর কৃষকরা হিমাগারে আলু রাখতে পারবেন না। এতে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

মেঘনা মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজের মালিক মঈন উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে ৫০ এবং ৮০ কেজি দুই ধরনের বস্তায় সংরক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। আগামী বছর থেকে ৫০ কেজির বস্তায় সংরক্ষণের নিয়ম কার্যকর করলে তখন সমস্যা হবে না। তার মতে, বর্তমানে ৫০ কেজির জালি ব্যাগ কিনতে পারছেন ২১ টাকায় এবং ৮০ কেজি পাটের বস্তা কিনছেন ৪৫ টাকায়। সেখানে কৃষকরা ৪২ টাকা দরে ৫০ কেজির বস্তা কিনতে চান না। আরও কম দামে তা সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

মুন্সীগঞ্জে ৮০ কেজির পরিবর্তে ৫০ কেজি বস্তায় আলু ভরার উচ্চ আদালতের নির্দেশের ফলে জেলার প্রায় পাঁচ লাখ কৃষক পড়েছেন বিপাকে। তারা জানান, চাহিদার চেয়ে বেশি ফলন হওয়ায় গত মৌসুমে বস্তাপ্রতি ৭০০ থেকে -০০ টাকা লোকসান হয়েছে। আগের ক্ষতি পোষাতে চলতি মৌসুমে ৮০ কেজির পাটের বস্তা ক্রয় করে সেই আলু হিমাগারে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু আকস্মিক এ সিদ্ধান্তের ফলে হিমাগারের মালিকরা তাদের আলু রাখছেন না। শেষ পর্যন্ত সংকটের সমাধান না হলে এবারও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন তারা।

দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদনে বিখ্যাত মুন্সীগঞ্জে ৭৮টি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। এ জেলার ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে ১৩ লাখ টনের বেশি আলু উৎপাদন হয়ে থাকে। কৃষকদের দেওয়া তথ্য মতে, তাদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণে ৫০ কেজির এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি বস্তা লাগবে। কিন্তু বাজারে সরবরাহ এর চেয়ে খুবই কম বলে জানান তারা।